শীর্ষ খবর
শীর্ষ খবরফিফা বিশ্বকাপ

৪৮ দলের বিশ্বকাপ নিয়ে যত শঙ্কা ছিল, বাস্তবতা বলছে ভিন্ন গল্প

নতুন ফরম্যাটে বিশ্বকাপ আরও প্রতিযোগিতামূলক, আরও বৈশ্বিক, আরও রোমাঞ্চকর লস অ্যাঞ্জেলেস: ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল টুর্নামেন্টের সম্প্রসারণ। প্রথমবারের মতো ৩২ দলের পরিবর্তে ৪৮ দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর। ফিফার এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই ফুটবল অঙ্গনে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক।

TTaaraaz24২২ Jun ২০২৬, ০৫:৫৪ AM8 পাঠক0 মন্তব্য
৪৮ দলের বিশ্বকাপ নিয়ে যত শঙ্কা ছিল, বাস্তবতা বলছে ভিন্ন গল্প
শেয়ার:FacebookXWhatsApp

নতুন ফরম্যাটে বিশ্বকাপ আরও প্রতিযোগিতামূলক, আরও বৈশ্বিক, আরও রোমাঞ্চকর

লস অ্যাঞ্জেলেস: ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল টুর্নামেন্টের সম্প্রসারণ। প্রথমবারের মতো ৩২ দলের পরিবর্তে ৪৮ দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর। ফিফার এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই ফুটবল অঙ্গনে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক।

সমালোচকদের একটি বড় অংশের ধারণা ছিল, অতিরিক্ত ১৬টি দল যুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্বকাপের মান কমে যাবে। তাদের যুক্তি ছিল, অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলগুলোর অংশগ্রহণ বাড়লে একপেশে ম্যাচের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং গ্রুপ পর্বের অনেক ম্যাচ দর্শকদের কাছে আকর্ষণ হারাবে। কেউ কেউ আশঙ্কা করেছিলেন, বিশ্বকাপ ধীরে ধীরে ইউরো বা কোপা আমেরিকার মতো উচ্চমানের প্রতিযোগিতার তুলনায় কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Inside Artcle

কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই ধারণাগুলোকে ভুল প্রমাণ করতে শুরু করেছে মাঠের বাস্তবতা।

১১ জুন থেকে শুরু হওয়া বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত দেখা গেছে অসংখ্য চমক, নাটকীয় ফলাফল এবং নতুন নতুন ফুটবল শক্তির উত্থান। বরং অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত ছোট দলগুলোই বিশ্বকাপকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

বিশ্বকাপের নতুন দর্শন

ফিফার মূল লক্ষ্য ছিল ফুটবলকে আরও বৈশ্বিক করা।

ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বাইরে আফ্রিকা, এশিয়া, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং ওশেনিয়ার দেশগুলোর জন্য বিশ্বকাপের দরজা আরও উন্মুক্ত করা হয়।

ফিফা সভাপতি Gianni Infantino বহুবার বলেছেন, বিশ্বকাপ শুধু বিশ্বের সেরা ৩২টি দলের প্রতিযোগিতা নয়; এটি এমন একটি মঞ্চ যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দেশ নিজেদের সামর্থ্য প্রদর্শনের সুযোগ পাবে।

২০২৬ বিশ্বকাপের শুরুতে দেখা যাচ্ছে, এই পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেতে শুরু করেছে।

ছোট দেশ, বড় স্বপ্ন

বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি হলো নতুন দেশগুলোর আত্মপ্রকাশ।

কেপ ভার্দে, কুরাসাও, উজবেকিস্তান, জর্ডানসহ বেশ কয়েকটি দেশ প্রথমবারের মতো কিংবা দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে।

এই দলগুলোর উপস্থিতি শুধু সংখ্যাবৃদ্ধি নয়; তারা মাঠে নিজেদের যোগ্যতাও প্রমাণ করছে।

ফুটবল এখন আর কয়েকটি দেশের একচেটিয়া খেলা নয়। আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক লিগে খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ এবং উন্নত অবকাঠামোর কারণে অপেক্ষাকৃত ছোট দেশগুলিও দ্রুত উন্নতি করছে।

কেপ ভার্দের রূপকথা

এই বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত দল কেপ ভার্দে।

মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার এই আফ্রিকান দ্বীপদেশটি বিশ্বকাপে এসেছে বড় কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই। কিন্তু মাঠে তারা দেখিয়েছে অসাধারণ দৃঢ়তা।

স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করার পর উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২ গোলের ড্র বিশ্ব ফুটবলকে বিস্মিত করেছে।

দলটির খেলোয়াড়দের মধ্যে তারকা খ্যাতি না থাকলেও রয়েছে অসাধারণ দলীয় সমন্বয়, শৃঙ্খলা এবং আত্মবিশ্বাস।

বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক ফুটবলে কৌশলগত সংগঠন অনেক সময় ব্যক্তিগত প্রতিভার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কেপ ভার্দে তার অন্যতম উদাহরণ।

কুরাসাওয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্ত

কুরাসাওয়ের গল্পও কম অনুপ্রেরণাদায়ক নয়।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট জনসংখ্যার দেশ হিসেবে অংশগ্রহণ করে তারা।

ইকুয়েডরের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে তারা বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম পয়েন্ট অর্জন করেছে।

গোলরক্ষক এলোয় রুমের ১৫টি সেভ এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের অন্যতম স্মরণীয় ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে এমন একটি পারফরম্যান্স পুরো দেশের ফুটবল সংস্কৃতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

স্কটল্যান্ডের প্রত্যাবর্তন

১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফিরেছে স্কটল্যান্ড।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাদের প্রত্যাবর্তন ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ছিল বিশেষ আবেগের বিষয়।

প্রথম ম্যাচে হাইতির বিপক্ষে জয় এবং মরক্কোর বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই দেখিয়ে স্কটল্যান্ড প্রমাণ করেছে তারা শুধু অংশ নিতে আসেনি।

বিশ্বকাপে স্কটিশ সমর্থকদের উপস্থিতিও বরাবরের মতো আলোচনায় রয়েছে। তাদের গান, উদযাপন এবং ইতিবাচক সমর্থন টুর্নামেন্টের পরিবেশকে আরও উৎসবমুখর করেছে।

শক্তিশালী দলগুলোর আধিপত্যও অব্যাহত

যদিও ছোট দলগুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, বড় দলগুলোও নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করছে।

আর্জেন্টিনা, যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং জার্মানি এখন পর্যন্ত প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করেছে।

বিশেষ করে আর্জেন্টিনা আবারও নিজেদের অন্যতম শিরোপা দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিক পুরো বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে, বয়স কেবল একটি সংখ্যা।

মেসির শেষ বিশ্বকাপ?

অনেকেই মনে করছেন এটি মেসির শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে।

৩৯ বছর বয়সেও তার খেলার মান বিস্ময়কর।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে শুধু গোলই করেননি, পুরো আক্রমণভাগকে পরিচালনা করেছেন তিনি।

মেসির অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং নেতৃত্ব আর্জেন্টিনাকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে আরেকটি ট্রফি জয়ের সুযোগও তার সামনে রয়েছে।

রোনালদোর কঠিন সময়

অন্যদিকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্য বিশ্বকাপের শুরুটা সুখকর হয়নি।

ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের ড্রয়ে তিনি কার্যত প্রভাবহীন ছিলেন।

সমালোচকদের মতে, তার বয়স এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতা এখন আগের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান।

তবে রোনালদোকে কখনওই পুরোপুরি হিসাবের বাইরে রাখা যায় না।

বড় মঞ্চে ফিরে আসার ক্ষমতা তিনি বহুবার দেখিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান

২০২৬ বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করছে।

তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

প্রথম দুই ম্যাচেই দাপুটে জয় তুলে নিয়ে তারা নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে।

মৌরিসিও পোচেত্তিনোর অধীনে দলটি এখন অনেক বেশি সংগঠিত।

মধ্যমাঠে গতি, আক্রমণে সৃজনশীলতা এবং রক্ষণে শৃঙ্খলার সমন্বয়ে তারা টুর্নামেন্টের অন্যতম শক্তিশালী দল হয়ে উঠেছে।

নতুন ফরম্যাট কেন সফল?

বিশ্বকাপ সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় সমালোচনা ছিল প্রতিযোগিতার মান কমে যাবে।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র।

কারণ:

প্রথমত, ফুটবলের মান বিশ্বজুড়ে বেড়েছে।

দ্বিতীয়ত, ছোট দেশগুলোর খেলোয়াড়রা এখন ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলার সুযোগ পাচ্ছেন।

তৃতীয়ত, আধুনিক বিশ্লেষণ ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ছোট দলগুলোকেও শক্তিশালী করে তুলেছে।

ফলে বড় দলগুলোর জন্য ম্যাচ জেতা আগের মতো সহজ নেই।

দর্শক আগ্রহ বেড়েছে

বিশ্বকাপ সম্প্রসারণের আরেকটি বড় সুবিধা হলো নতুন বাজার সৃষ্টি।

আফ্রিকা, এশিয়া এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের কোটি কোটি নতুন দর্শক নিজেদের দেশকে বিশ্বকাপে দেখতে পাচ্ছেন।

ফলে টেলিভিশন দর্শকসংখ্যা, ডিজিটাল এনগেজমেন্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার পরিমাণ বেড়েছে।

ফিফার জন্য এটি বাণিজ্যিকভাবেও বড় সাফল্য।

অর্থনৈতিক প্রভাব

বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক ইভেন্ট।

৪৮ দলের বিশ্বকাপের মাধ্যমে আরও বেশি দেশ সরাসরি যুক্ত হওয়ায় স্পন্সরশিপ, সম্প্রচার অধিকার এবং পর্যটন আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর বিভিন্ন শহরে লক্ষাধিক সমর্থকের উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছে।

হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও খুচরা ব্যবসা ব্যাপকভাবে লাভবান হচ্ছে।

নকআউট পর্বের উত্তেজনা

গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে ৩২ দলের নকআউট রাউন্ড।

এটিও নতুন ফরম্যাটের একটি বড় বৈশিষ্ট্য।

আগে ১৬ দল নকআউটে খেললেও এবার সুযোগ পাচ্ছে আরও বেশি দেশ।

ফলে শেষ ষোলোর আগেই অনেক দেশের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পরিবর্তে তারা আরও দীর্ঘ সময় প্রতিযোগিতায় থাকতে পারছে।

এতে টুর্নামেন্টের উত্তেজনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ

বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ ভবিষ্যতের জন্য একটি মডেল হয়ে উঠতে পারে।

যদি টুর্নামেন্ট শেষ পর্যন্ত একই রকম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ থাকে, তাহলে ৪৮ দলের ফরম্যাট স্থায়ীভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে।

এটি ফুটবলকে আরও বৈশ্বিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলবে।

আফ্রিকা, এশিয়া ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলো আরও বেশি বিনিয়োগ করবে ফুটবল উন্নয়নে।

উপসংহার

২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি শোনা গিয়েছিল তা হলো—‘৪৮ দলের বিশ্বকাপ কি খুব বড় হয়ে গেল না?’

টুর্নামেন্টের প্রথম কয়েক সপ্তাহ সেই প্রশ্নের জবাব দিয়েছে।

কেপ ভার্দের সাহসী লড়াই, কুরাসাওয়ের ঐতিহাসিক পয়েন্ট, স্কটল্যান্ডের আবেগঘন প্রত্যাবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান, মেসির জাদু এবং অসংখ্য অপ্রত্যাশিত ফলাফল প্রমাণ করেছে যে বিশ্বকাপের বিস্তার প্রতিযোগিতার সৌন্দর্য নষ্ট করেনি।

বরং নতুন দেশ, নতুন গল্প এবং নতুন নায়কদের জন্ম দিয়েছে।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর এখন আগের চেয়ে আরও বেশি বৈশ্বিক, আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আরও বেশি রোমাঞ্চকর।

যারা মনে করেছিলেন ৪৮ দলের বিশ্বকাপ মান হারাবে, তাদের জন্য এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় বার্তা সম্ভবত একটাই—ফুটবল এখনও বিস্ময় সৃষ্টি করতে জানে, আর সেই বিস্ময়ের কোনো সীমানা নেই।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

মন্তব্য (0)

Taaraaz Construction – Quality, Trust & Excellence in Every Project!
sticky add
popup