রংপুর, ১ জুলাই ২০২৬ (বাসস): স্বল্প খরচে অধিক লাভের সম্ভাবনার কারণে রংপুর কৃষি অঞ্চলে বাণিজ্যিক কলাচাষে এক নীরব বিপ্লব ঘটেছে। উপযোগী মাটি, অনুকূল আবহাওয়া, ধারাবাহিক বাম্পার ফলন এবং সন্তোষজনক বাজারমূল্যের কারণে কলাচাষ এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক ও জনপ্রিয় কৃষি উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে বহু কৃষক আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে।
তবে উৎপাদন বাড়লেও আধুনিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কলা নষ্ট হচ্ছে। ফলে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সম্ভাবনাময় এই খাতটি কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলায় সাগর, মালভোগ, চিনি চম্পা ও মেহের সাগরসহ বিভিন্ন জাতের কলার ব্যাপক আবাদ হচ্ছে। স্বল্প পুঁজি ও কম শ্রমে ভালো লাভ হওয়ায় তরুণ ও শিক্ষিত উদ্যোক্তারাও এখন কলাচাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪ হাজার ২০৮ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ১২ হাজার ৩৫৭ মেট্রিক টন কলা উৎপাদিত হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ হাজার ৩৫৬ হেক্টর জমি থেকে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ২২৭ মেট্রিক টনে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার ৭৭ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯১৬ মেট্রিক টন কলা উৎপাদন করেন কৃষকরা।
উৎপাদিত কলা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকায় বিক্রি হয় রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ী হাট, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী ও ফাঁসিতলা হাট, রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের বিভিন্ন বাজারসহ আঞ্চলিক পাইকারি বাজারে।
মিঠাপুকুর উপজেলার টাকেয়া গ্রামের কৃষক হামিদুর রহমান, বকুল মিয়া ও আনোয়ার হোসেন জানান, গত কয়েক বছরে কলাচাষ তাদের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। তবে অতিরিক্ত উৎপাদনের সময় কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় বাধ্য হয়ে কম দামে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কলা বিক্রি করতে হয়।
কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, “একটু দেরি হলেই কলা নষ্ট হতে শুরু করে। এতে প্রত্যাশিত লাভ পাওয়া যায় না।”
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার পাইকানটারী গ্রামের কৃষকরা জানান, এক একর জমিতে কলাচাষে প্রায় ১ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এক একরে প্রায় এক হাজারটি চারা রোপণ করা যায় এবং প্রতিটি কাঁদি ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হলে বছরে সাড়ে তিন লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব।
রংপুর সদর উপজেলার কৃষক ইসহাক আলী বলেন, প্রতিটি বড় কলার হাটের পাশে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত কোল্ড স্টোরেজ বা বিশেষায়িত সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করা হলে কৃষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—সবাই উপকৃত হবেন। এতে সারা বছর টাটকা ও নিরাপদ কলা সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী টিটু বলেন, আধুনিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে রংপুর অঞ্চলের কলা শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
তার মতে, কৃষকদের জন্য স্বল্পসুদে ব্যাংক ঋণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত কোল্ড স্টোরেজ, কলাভিত্তিক খাদ্যপণ্য উৎপাদনের কারখানা, আধুনিক প্যাকেজিং ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক উপায়ে কলা পাকানোর প্রযুক্তি চালু করা সময়ের দাবি।
রংপুর অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রতিবছরই এ অঞ্চলে কলা চাষের পরিধি বাড়ছে। ডিএইর বিভিন্ন উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচির ফলে কৃষকরা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পাশাপাশি পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে কলাচাষ সম্প্রসারণে আগ্রহী হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ অবকাঠামো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা গেলে রংপুর অঞ্চলের কলাচাষ দেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে।