ঢাকা, ২২ জুন ২০২৬: বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের পাশাপাশি দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগ মহলেও এই সফরকে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ ও আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সফরটি সফল হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
ঢাকা, ২২ জুন ২০২৬: বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের পাশাপাশি দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগ মহলেও এই সফরকে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ ও আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সফরটি সফল হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন গতি আনার লক্ষ্য
বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প, বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে চীনা সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন অংশীদার এবং সবচেয়ে বড় আমদানির উৎস দেশগুলোর একটি।
শিল্প যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক পণ্য, কাঁচামাল, টেক্সটাইল উপকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের বড় অংশ চীন থেকে আমদানি করা হয়।
মালয়েশিয়া সফর শেষে চীনের পথে প্রধানমন্ত্রী
দুই দিনের সরকারি সফরে বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর।
মালয়েশিয়া সফর শেষ করে সোমবার রাতে কুয়ালালামপুর থেকে চীনের দালিয়ান শহরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেবেন। এসব বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি সহযোগিতা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক সংযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
১৫ থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনা
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, সফর চলাকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), চুক্তি, কর্মপরিকল্পনা এবং প্রটোকল স্বাক্ষরিত হতে পারে।
এসব চুক্তির মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি সহযোগিতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জ্বালানি খাত সম্পর্কিত বিভিন্ন উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সামার দাভোসে প্রধান বক্তা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী
চীন সফরের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী দালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) সামার দাভোস সম্মেলনে অংশ নেবেন।
সেখানে তিনি ‘Climate Leadership in a Shifting Global Landscape’ শীর্ষক অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখবেন।
এছাড়া বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট, বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি এবং শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করারও কথা রয়েছে তাঁর।
পরে বেইজিংয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, এক্সিম ব্যাংক এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
বিনিয়োগ ফোরামে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরা হবে
আগামী ২৫ জুন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ প্রধান বক্তা হিসেবে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এই ফোরামে চীনের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী, বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়িক প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
সরকার আশা করছে, এ ফোরামের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার সুযোগ তৈরি হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের সম্ভাবনা আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা যাবে।
বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রচেষ্টা
বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২২ থেকে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে।
তবে এই বাণিজ্যের বড় অংশই বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর হওয়ায় উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য ঘাটতি বিদ্যমান।
ব্যবসায়ীরা মনে করেন, তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো গেলে এই ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশ বর্তমানে শিল্পায়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরের পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শিল্প সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট অবকাঠামো এবং ডিজিটাল অর্থনীতি বিষয়ক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চীনা বিনিয়োগ যদি শুধু অবকাঠামো খাতে সীমাবদ্ধ না থেকে উৎপাদনশিল্প, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস, কৃষি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সম্প্রসারিত হয়, তাহলে কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয় উভয়ই বৃদ্ধি পাবে।
বিআরআই ও বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগে সহযোগিতা
বাংলাদেশ চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
একই সঙ্গে চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (GDI)-এর আওতায়ও বাংলাদেশ বিভিন্ন সহযোগিতা কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুটি উদ্যোগের আওতায় অবকাঠামো উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলম মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
তাঁর মতে, চীনা বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শিল্প, জ্বালানি, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে আগ্রহ দেখালেও প্রত্যাশিত মাত্রায় বিনিয়োগ এখনো আসেনি।
তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শিল্প সহযোগিতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
একই সঙ্গে তিনি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশি টাকা ও চীনা ইউয়ানের ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, এতে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং লেনদেন ব্যয় হ্রাস পাবে।
চীনা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে
চীনের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান সিসিইসিসির দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক ইউসেফ শু বলেছেন, চীনা ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী।
তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে অংশ নিতে চীনের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
সামনে যে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ মূলত তিনটি বিষয়ে নির্ভর করবে—
১. চুক্তি ও বিনিয়োগের কার্যকর বাস্তবায়ন
২. রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি
৩. প্রযুক্তি স্থানান্তর ও শিল্প সক্ষমতা উন্নয়ন
এই তিন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হলে বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।