শীর্ষ খবর

এক মিনিটে উড়োজাহাজের কম্পিউটার–ব্যবস্থা হ্যাক করা কি সত্যিই সম্ভব?

উড়োজাহাজ আকাশে কয়েকশ যাত্রী নিয়ে ছুটছে। হঠাৎ কেউ একটি কম্পিউটারে কয়েকটি কমান্ড লিখল, আর মাত্র এক মিনিটের মধ্যে বিমানের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তার হাতে চলে গেল। হলিউডের সিনেমা কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর থ্রিলারে এমন দৃশ্য বেশ পরিচিত। কিন্তু বাস্তব বিমান চলাচলের জগতে বিষয়টি কি এতটাই সহজ?

TTaaraaz24bd১৯ Aug ২০২৬, ০৭:২৭ AM1 পাঠক0 মন্তব্য
এক মিনিটে উড়োজাহাজের কম্পিউটার–ব্যবস্থা হ্যাক করা কি সত্যিই সম্ভব?
শেয়ার:FacebookXWhatsApp

উড়োজাহাজ আকাশে কয়েকশ যাত্রী নিয়ে ছুটছে। হঠাৎ কেউ একটি কম্পিউটারে কয়েকটি কমান্ড লিখল, আর মাত্র এক মিনিটের মধ্যে বিমানের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তার হাতে চলে গেল। হলিউডের সিনেমা কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর থ্রিলারে এমন দৃশ্য বেশ পরিচিত। কিন্তু বাস্তব বিমান চলাচলের জগতে বিষয়টি কি এতটাই সহজ?

Inside Artcle

সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, এক মিনিটে উড়োজাহাজের কম্পিউটার–ব্যবস্থা হ্যাক করে পুরো বিমান নিয়ন্ত্রণে নেওয়া বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি সরলীকৃত ধারণা। আধুনিক বাণিজ্যিক উড়োজাহাজে একাধিক স্তরের কম্পিউটার ব্যবস্থা, বিচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক, নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ, সফটওয়্যার যাচাই এবং অপারেশনাল প্রক্রিয়া রয়েছে। ফলে কোনো একটি দুর্বলতা থাকলেই পুরো বিমান মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।

বিমানের কম্পিউটার ব্যবস্থা আসলে কী?

আধুনিক উড়োজাহাজ মূলত একটি উড়ন্ত কম্পিউটার নেটওয়ার্ক। তবে এটিকে সাধারণ অফিসের কম্পিউটার বা ঘরের ওয়াই-ফাই ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি ভুলভাবে বোঝার ঝুঁকি থাকে।

বিমানে বিভিন্ন কাজের জন্য আলাদা আলাদা এভিওনিক্স ব্যবস্থা থাকে। ফ্লাইট কন্ট্রোল, নেভিগেশন, যোগাযোগ, ইঞ্জিন-সংক্রান্ত তথ্য, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের জন্য পৃথক কম্পিউটিং ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগুলোর সবকিছু একই ধরনের নেটওয়ার্কে অবাধে যুক্ত থাকে না। বিমান নির্মাণ ও পরিচালনায় নিরাপত্তার একটি মৌলিক দর্শন হলো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে যথাযথ বিচ্ছিন্নতা রাখা। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে কোনো একটি অংশে সমস্যা দেখা দিলে সেটি যেন সহজে অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে না পারে।

তাহলে কি উড়োজাহাজ হ্যাক করা অসম্ভব?

না। কোনো প্রযুক্তি ব্যবস্থাকেই সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত বলা যায় না। বিমান চলাচল শিল্পও সাইবার নিরাপত্তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে। বিমানবন্দর, এয়ারলাইনস, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, যাত্রীসেবা, ফ্লাইট-অপারেশন অবকাঠামো এবং বিমানের বিভিন্ন ডিজিটাল উপাদান একেক ধরনের সাইবার ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

সাইবার আক্রমণ সম্ভব হওয়া এবং আকাশে থাকা একটি বাণিজ্যিক বিমানের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়া একই বিষয় নয়।

কোনো তথ্যব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটলেও আক্রমণকারীকে একাধিক নিরাপত্তা স্তর অতিক্রম করতে হতে পারে। আবার একটি সিস্টেমে প্রবেশাধিকার পাওয়া মানেই অন্য গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমেও নিয়ন্ত্রণ পাওয়া নয়।

এক মিনিটের দাবি কোথা থেকে আসে?

‘এক মিনিটে হ্যাক’ ধরনের দাবি সাধারণত প্রযুক্তিগত বাস্তবতার চেয়ে নাটকীয়তার ওপর বেশি নির্ভরশীল। একটি সফটওয়্যার দুর্বলতা শনাক্ত করা, কোনো ডিভাইসে অননুমোদিত প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি করা এবং শেষ পর্যন্ত বিমানের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাপ।

সাইবার নিরাপত্তার ভাষায় এগুলোকে একসঙ্গে একটি সরল প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যায় না।

কোনো দুর্বলতা থাকলে প্রথম প্রশ্ন হয়, সেটি কোথায়? দ্বিতীয় প্রশ্ন, সেটি কীভাবে ব্যবহারযোগ্য? তৃতীয় প্রশ্ন, আক্রমণকারী সেখানে কী ধরনের প্রবেশাধিকার পেতে পারে? এরপর আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: সেই প্রবেশাধিকার কি নিরাপত্তার অন্য স্তর অতিক্রম করতে পারে?

এই ধারাবাহিকতা দেখলেই বোঝা যায়, সিনেমার মতো কয়েকটি মুহূর্তে পুরো বিমান দখলে নেওয়ার ধারণাটি বাস্তব বিমান নিরাপত্তার জটিলতার সঙ্গে মেলে না।

যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী?

বিমানযাত্রীদের সাধারণত সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করে বিমানের ফ্লাইট কন্ট্রোল বা নেভিগেশন ব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তব বিমান নিরাপত্তা আরও বিস্তৃত।

সাইবার নিরাপত্তা কেবল বিমানের ভেতরের কম্পিউটার নিয়ে নয়। এয়ারলাইনসের তথ্যব্যবস্থা, বিমানবন্দরের ডিজিটাল অবকাঠামো, কর্মীদের অ্যাকাউন্ট, রক্ষণাবেক্ষণ তথ্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও নিরাপত্তার অংশ।

অর্থাৎ একটি আধুনিক এয়ারলাইনসের সাইবার নিরাপত্তা হলো একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা-পরিধি। কোথাও দুর্বলতা থাকলে তা শনাক্ত করা, ঝুঁকি মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই মূল লক্ষ্য।

‘হ্যাক’ শব্দটির অতিরিক্ত ব্যবহার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো প্রযুক্তিগত অস্বাভাবিকতা দেখা দিলেই সেটিকে অনেক সময় ‘হ্যাক’ বলা হয়। কিন্তু সাইবার নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি হ্যাকিং নয়।

কখনো সেটি সফটওয়্যার বাগ। কখনো কনফিগারেশন সমস্যা। কখনো মানবিক ভুল। আবার কখনো একটি সাধারণ প্রযুক্তিগত বিভ্রাট।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে। কারণ একটি শব্দের অতিরঞ্জিত ব্যবহার মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।

বিমান নির্মাতারা কীভাবে ঝুঁকি কমায়?

বিমান চলাচলের নিরাপত্তা একটি বহুস্তরীয় কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিমানের সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার উন্নয়নের সময় নিরাপত্তা বিবেচনা করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা করা হয়। বিভিন্ন ধরনের ব্যর্থতা ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে নকশা তৈরি করা হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত থাকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান।

এখানে একটি ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: defence in depth, অর্থাৎ একাধিক প্রতিরক্ষা স্তর।

একটি স্তর ব্যর্থ হলেও পরবর্তী স্তর ঝুঁকি সীমিত করতে পারে। ফলে নিরাপত্তা কোনো একক পাসওয়ার্ড, কোনো একটি সফটওয়্যার বা একটি ফায়ারওয়ালের ওপর নির্ভর করে না।

পাইলটের ভূমিকা কোথায়?

আধুনিক উড়োজাহাজে অটোমেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও পাইলটরা কেবল কম্পিউটারের ওপর নির্ভরশীল নন। উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত ক্রু, নির্ধারিত পদ্ধতি এবং একাধিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে।

কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে সেটি শনাক্ত করা এবং যথাযথ প্রতিক্রিয়া দেওয়ার জন্য বিমানচালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

তাই একটি সাইবার ঘটনা ঘটলেই পাইলটরা অসহায় হয়ে পড়বেন, এমন ধারণাও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ভবিষ্যতের ঝুঁকি কোথায়?

প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, সংযুক্ত ব্যবস্থার পরিমাণও বাড়ছে। নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্বও বাড়ছে।

ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে সংযুক্ত সিস্টেমের জটিলতা, সফটওয়্যার সরবরাহ শৃঙ্খল, তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তি এবং মানবিক ভুলের সমন্বিত ঝুঁকি।

তবে এ কারণেই বিমান চলাচল খাতে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা, পরীক্ষা এবং নিয়মনীতি ক্রমাগত শক্তিশালী করা হচ্ছে।

শেষ কথা

এক মিনিটে উড়োজাহাজের কম্পিউটার–ব্যবস্থা হ্যাক করে একটি বাণিজ্যিক বিমান সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ধারণা মূলত অতিরঞ্জিত। বাস্তব বিমান চলাচলের প্রযুক্তি অনেক বেশি জটিল এবং বহুস্তরীয়।

এর অর্থ এই নয় যে বিমান চলাচলে সাইবার ঝুঁকি নেই। বরং ঝুঁকি রয়েছে বলেই নিরাপত্তা প্রকৌশল, নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্নতা, সফটওয়্যার যাচাই, অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পরীক্ষা এত গুরুত্বপূর্ণ।

মহাকাশে একটি বিমান কয়েক হাজার মানুষের নিরাপত্তা বহন করে। তাই এর ডিজিটাল নিরাপত্তাও সাধারণ কম্পিউটার নিরাপত্তার মতো নয়। এখানে প্রতিটি সম্ভাব্য দুর্বলতাকে বিবেচনা করতে হয় সতর্কতার সঙ্গে, কারণ প্রযুক্তির একটি ছোট ত্রুটিও বড় ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

সিনেমায় এক মিনিট যথেষ্ট হতে পারে। বাস্তব বিমান চলাচলে নিরাপত্তা অনেক বেশি জটিল, পরিকল্পিত এবং বহুস্তরীয়।

.

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

মন্তব্য (0)

sticky add
Popup
এক মিনিটে উড়োজাহাজের কম্পিউটার–ব্যবস্থা হ্যাক করা কি সত্যিই সম্ভব? | তারাজ২৪