শীর্ষ খবর
শীর্ষ খবররাজনীতি

রাষ্ট্রপতি পদে কারা কত দিন থেকেছেন, কে কোথায় আছেন

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে মাত্র চারজন রাষ্ট্রপতি তাঁদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ করতে পেরেছেন। অন্যদের বেশির ভাগই পদত্যাগ করেছেন বা করতে বাধ্য হয়েছেন। আর রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দুজন। এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাসের অস্থিরতাকে স্পষ্ট করে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত কোনো রাষ্ট্রপতিই মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।

TTaaraaz24bd২২ Aug ২০২৬, ০৮:৫৪ AM1 পাঠক0 মন্তব্য
রাষ্ট্রপতি পদে কারা কত দিন থেকেছেন, কে কোথায় আছেন
শেয়ার:FacebookXWhatsApp

রাষ্ট্রপতি পদে কারা কত দিন থেকেছেন, কে কোথায় আছেন

রাষ্ট্রপতি পদে কারা কত দিন থেকেছেন, কে কোথায় আছেন

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে মাত্র চারজন রাষ্ট্রপতি তাঁদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ করতে পেরেছেন। অন্যদের বেশির ভাগই পদত্যাগ করেছেন বা করতে বাধ্য হয়েছেন। আর রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দুজন।

Inside Artcle

এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাসের অস্থিরতাকে স্পষ্ট করে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত কোনো রাষ্ট্রপতিই মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।

অন্যদিকে যাঁরা পূর্ণ মেয়াদ শেষ করেছেন, তাঁদের সবাই ১৯৯১ সালের পর দায়িত্বে এসেছেন। তবে তাঁদের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সময় পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির হাতে আগের সময়ের মতো বিস্তৃত নির্বাহী ক্ষমতা ছিল না।

স্বাধীনতার পর ১৯ জন দায়িত্ব পালন করেছেন

স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি কিংবা রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে মোট ১৯ জন দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন একাধিকবার ভিন্ন পরিচয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন।

এই দীর্ঘ তালিকায় যেমন রয়েছে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের নাম, তেমনি রয়েছে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খন্দকার মোশতাক আহমদ, বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, জিয়াউর রহমান, আবদুস সাত্তার, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, আবদুর রহমান বিশ্বাস, এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, জিল্লুর রহমান, আবদুল হামিদ, মো. সাহাবুদ্দিন এবং সর্বশেষ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এই তালিকা শুধু ব্যক্তিদের নামের সমষ্টি নয়। বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার বিবর্তনের এক ধরনের রাজনৈতিক কালপঞ্জি।

হত্যাকাণ্ডের শিকার দুই রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতি পদে থাকা অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দুজন। প্রথমজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।

এরপর ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন।

এই দুটি হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে গভীর অভিঘাত তৈরি করে। শুধু রাষ্ট্রপতির পদ নয়, এর সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোও বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিদের কেউ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত কোনো রাষ্ট্রপতিই মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।

রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি জনভোটের ব্যবস্থা ছিল এমন সময় দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। পরবর্তী সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদ সদস্যদের ভোটে সীমাবদ্ধ হয়।

১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার কাঠামোও বদলে যায়। সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রপতি মূলত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।

আবদুল হামিদ: সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন মো. আবদুল হামিদ।

জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। এরপর আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। পাঁচ বছর পর ২০১৮ সালে আবারও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হয় ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল।

অর্থাৎ সব মিলিয়ে মো. আবদুল হামিদ প্রায় ১০ বছর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি পদে থাকার সর্বোচ্চ সময়।

বঙ্গভবন ছাড়ার সময় তাঁকে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় বিদায় জানানো হয়। দেওয়া হয় গার্ড অব অনার। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তাঁকে বিদায় জানান।

এরপর স্ত্রী রাশিদা খানমকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রাজধানীর নিকুঞ্জের নিজ বাসভবনে ফিরে যান।

রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার পর আবদুল হামিদ কোথায়?

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছাড়ার পর আবদুল হামিদ অনেকটাই জনসম্মুখের বাইরে চলে যান। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাঁকে খুব বেশি প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।

চিকিৎসার জন্য তিনি থাইল্যান্ডেও গিয়েছিলেন। ব্যাংককের একটি হাসপাতালে প্রায় এক মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর দেশে ফেরেন।

তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগও জমা পড়েছে। তবে সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর বর্তমান জীবন অনেকটাই ব্যক্তিগত পরিসরকেন্দ্রিক।

মো. সাহাবুদ্দিন: পাঁচ বছর পূর্ণ করার আগেই বিদায়

মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হিসেবে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিলে। কিন্তু সেই সময় পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে থাকতে পারেননি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাঁর পদে থাকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। বিভিন্ন পক্ষ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি ওঠে। এমনকি বঙ্গভবনের সামনেও বিক্ষোভ হয়।

পরবর্তীতে তিনি অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

পদত্যাগপত্রে তিনি হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। তিনি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনের কথাও জানান।

সাহাবুদ্দিন এখন কোথায়?

পদত্যাগের পর মো. সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবন ছেড়ে গুলশানের নিজের ফ্ল্যাটে ওঠেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর জীবনযাপন এখন অনেকটাই সীমিত।

তিনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার পর এক ধরনের স্বস্তি পেলেও অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কঠিন।

তবে তিনি লেখালেখির চেষ্টা করছেন। বঙ্গভবনে কাটানো সময় নিয়ে বই লেখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

এই বই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত দলিল হয়ে উঠতে পারে।

হাফিজ উদ্দিন আহমদের অন্তর্বর্তী ভূমিকা

সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

এটি ছিল একটি অন্তর্বর্তীকালীন সাংবিধানিক ব্যবস্থা। তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে পূর্ণ মেয়াদের দায়িত্ব নেননি। তাঁর মূল সাংবিধানিক পরিচয় ছিল স্পিকার।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর হাফিজ উদ্দিন আহমদ আবার স্পিকারের দায়িত্বে ফিরে যান।

এভাবে রাষ্ট্রপতি পদে সাময়িক দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের তালিকায় তাঁর নামও যুক্ত হয়।

মির্জা ফখরুল: নতুন অধ্যায়ের সূচনা

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

পরদিন বঙ্গভবনে শপথ নেওয়ার মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা।

রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর মেয়াদ পূর্ণ হবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য সময়ই দেবে।

অতীতের রাষ্ট্রপতিদের উত্তরাধিকার

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা। কারও সময় ছিল সামরিক শাসনের, কারও সময় গণতান্ত্রিক রূপান্তরের, আবার কারও সময় ছিল রাজনৈতিক সংঘাত ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের।

তবে একটি ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। রাষ্ট্রপতির পদটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পরিবর্তনশীল চরিত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

অন্যদিকে মেয়াদ শেষ করা রাষ্ট্রপতিদের সবাই ১৯৯১ সালের পর দায়িত্বে আসেন। আর এই রাষ্ট্রপতিদের সেই অর্থে কোনো নির্বাহী ক্ষমতা ছিল না।

এই পার্থক্যটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার বিবর্তন বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি পদ একই থাকলেও সময়ের সঙ্গে তার সাংবিধানিক কার্যকারিতা ও রাজনৈতিক তাৎপর্য বদলেছে।

উপসংহার

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাস আসলে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিরূপ। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতির পদ কখনো ক্ষমতার কেন্দ্র, কখনো সামরিক শাসনের প্রতীক, আবার কখনো সংসদীয় গণতন্ত্রের সাংবিধানিক অলংকরণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে মাত্র চারজন রাষ্ট্রপতি তাঁদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ করতে পেরেছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন মো. আবদুল হামিদ।

মো. সাহাবুদ্দিন অসুস্থতার কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন। তাঁর পর হাফিজ উদ্দিন আহমদ অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করেন। এরপর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন।

অতীতের দিকে তাকালে একটি বিষয় পরিষ্কার: বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে স্থায়িত্ব বরাবরই রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। নতুন রাষ্ট্রপতি সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কতটা ভিন্ন পথ তৈরি করতে পারেন, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

মন্তব্য (0)

sticky add
Popup
রাষ্ট্রপতি পদে কারা কত দিন থেকেছেন, কে কোথায় আছেন | তারাজ২৪