নিজস্ব প্রতিবেদক | Taaraaz24
সংরক্ষিত বনে গুলি করে হাতি হত্যা: কক্সবাজারে কারা জড়িত, কী বলছে তদন্ত ও স্থানীয়রা
কক্সবাজারের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে একের পর এক হাতি হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। সরকারি পরিসংখ্যান, স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য ও তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে উঠে এসেছে গুলিতে হাতি হত্যার নানা তথ্য। বিস্তারিত পড়ুন।

কক্সবাজারের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে একের পর এক হাতি হত্যার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সরকারি নথি, মাঠপর্যায়ের তথ্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বনাঞ্চলে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাতির মৃত্যুর ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের একটি গুরুতর সংরক্ষণ সংকটের অংশ।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত এক দশকে কক্সবাজার অঞ্চলে গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত ৯টি হাতির মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে এই সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। এতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
গভীর রাতে গুলির শব্দ, এরপর আহত হাতির মৃত্যু
২০২৩ সালের জুন মাসের এক গভীর রাতে কক্সবাজারের খুটাখালী বনসংলগ্ন এলাকায় গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় এক স্থানীয় বাসিন্দার। বাইরে এসে তিনি দেখতে পান একটি পূর্ণবয়স্ক হাতি গুরুতর আহত অবস্থায় একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কাতরাচ্ছে। মাথা থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এবং কিছুক্ষণ পর প্রাণীটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পরদিন সেটির মৃত্যু হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় আম, ধান ও অন্যান্য ফসলের মৌসুমে প্রায়ই হাতির পাল খাদ্যের সন্ধানে বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসে। অনেক সময় ফসল রক্ষার অজুহাতে কিছু ব্যক্তি তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাতির চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ করিডর এখন ঝুঁকিতে
যে বনাঞ্চলে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি কক্সবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতির করিডর হিসেবে পরিচিত। এই করিডর ব্যবহার করে বন্য হাতির পাল নিয়মিত এক বন থেকে অন্য বনে চলাচল করে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, করিডরের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ ও হাতির সংঘাত দ্রুত বেড়ে যায়। এতে একদিকে কৃষিজমির ক্ষতি হয়, অন্যদিকে প্রাণ হারায় বিপন্ন বন্য হাতি।
স্থানীয়দের অভিযোগ: ফসল রক্ষার নামে চলছে গুলি
খুটাখালী ও আশপাশের এলাকার একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ধান পাকার মৌসুমে বনসংলগ্ন জমিতে রাতে পাহারা দেওয়া হয়। অনেক কৃষক উঁচু বাঁশের মাচা তৈরি করে সেখানে অবস্থান নেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব মাচা থেকেই অনেক সময় দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হাতির দিকে গুলি ছোড়া হয়। যদিও প্রত্যেক অভিযোগের সত্যতা পৃথকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে বন বিভাগের বিভিন্ন মামলায় এমন অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে কী উঠে এসেছে
বন বিভাগের উদ্যোগে পূর্বে গঠিত একটি তদন্ত কমিটি হাতি হত্যার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে।
তদন্তে উল্লেখ করা হয়—
- হাতির চলাচলের করিডর সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
- বনাঞ্চলে অবৈধ দখল বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- বিদ্যুতের ফাঁদ ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার রোধে টহল জোরদার প্রয়োজন।
- বন্য হাতির খাদ্য ও পানির উৎস সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
- স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল উদ্ধার ও সচেতনতা দল গঠন জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
আইইউসিএনের তালিকায় মহাবিপন্ন এশীয় হাতি
প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা IUCN-এর সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বন্য এশীয় হাতি বর্তমানে মহাবিপন্ন (Critically Endangered) অবস্থায় রয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, দেশের অধিকাংশ বন্য হাতির আবাস কক্সবাজার, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। ফলে এই এলাকায় প্রতিটি হাতির মৃত্যু দেশের সামগ্রিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মানুষ-হাতি সংঘাত কেন বাড়ছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, বনভূমি সংকুচিত হওয়া, অবৈধ দখল, কৃষিজমির সম্প্রসারণ এবং হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ দখল হয়ে যাওয়ায় মানুষ ও হাতির মুখোমুখি সংঘাত আগের তুলনায় বেড়েছে।
খাদ্যের সন্ধানে বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসা হাতিগুলো অনেক সময় ফসল নষ্ট করে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একাংশ অবৈধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র বা অন্যান্য প্রাণঘাতী উপায় ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে সংরক্ষণবিদরা বলছেন, এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; বরং এতে বিপন্ন প্রজাতির অস্তিত্ব আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান





