কক্সবাজারের খুটাখালী বনাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, সংরক্ষিত বনের পাশের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের বিভিন্ন স্থানে গাছের ওপর বাঁশ ও ছন দিয়ে তৈরি অস্থায়ী মাচা রয়েছে। দিনের বেলায় এগুলো ফাঁকা থাকলেও সন্ধ্যার পর সেখানে পাহারা দেওয়া হয় বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
বনসংলগ্ন এলাকায় রাতের মাচা, অভিযোগের তীর সশস্ত্র পাহারাদারদের দিকে
কক্সবাজারের খুটাখালী বনাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, সংরক্ষিত বনের পাশের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের বিভিন্ন স্থানে গাছের ওপর বাঁশ ও ছন দিয়ে তৈরি অস্থায়ী মাচা রয়েছে। দিনের বেলায় এগুলো ফাঁকা থাকলেও সন্ধ্যার পর সেখানে পাহারা দেওয়া হয় বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের দাবি, পাকা ধান ও অন্যান্য ফসল রক্ষার উদ্দেশ্যে এসব মাচায় অবস্থান নেন কৃষক বা জমির দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা। অভিযোগ রয়েছে, হাতির পাল ফসলের জমিতে ঢুকলে অনেক ক্ষেত্রে সেখান থেকেই দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে গুলি ছোড়া হয়।
বন বিভাগের নিবন্ধিত 'ভিলেজার' ব্যবস্থাকে ঘিরে প্রশ্ন
স্থানীয় সূত্র ও বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে একটি 'ভিলেজার' ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে বন সংরক্ষণে সহযোগিতার শর্তে কিছু পরিবারকে বনসংলগ্ন এলাকায় বসবাস ও সীমিত পরিসরে কৃষিকাজের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক এলাকায় বসতি ও কৃষিজমির পরিমাণও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং কৃষিকাজের সম্প্রসারণের ফলে মানুষ ও হাতির সংঘাত আগের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয়েছে।
ফসল রক্ষার নামে প্রাণঘাতী ব্যবস্থা?
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, হাতির পাল নিয়মিত যেসব এলাকা অতিক্রম করে, সেসব স্থানে রাতের বেলায় পাহারা দেওয়ার সময় অনেকেই দেশীয় বন্দুক সঙ্গে রাখেন।
তাদের অভিযোগ, হাতি তাড়ানোর পরিবর্তে কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি গুলি চালানো হয়।
যদিও প্রত্যেক অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, বন বিভাগের একাধিক মামলায় হাতি হত্যার ঘটনায় কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দাকে আসামি করার তথ্য রয়েছে।
কতজন ভিলেজার রয়েছেন?
মাঠপর্যায়ের বন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার অঞ্চলের প্রতিটি বিট অফিসের অধীনে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন নিবন্ধিত ভিলেজার রয়েছেন।
এ ধরনের বিট অফিসের সংখ্যা প্রায় ৬০টি হওয়ায় মোট ভিলেজারের সংখ্যা আনুমানিক এক হাজারেরও বেশি হতে পারে।
তবে বন বিভাগ স্বীকার করেছে, এ ব্যবস্থার হালনাগাদ ও পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার বর্তমানে নেই।
সরকারি হিসাব ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় পার্থক্য
সরকারি নথিতে গত এক দশকে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৯টি হাতির মৃত্যুর তথ্য থাকলেও মাঠপর্যায়ে কাজ করা কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
হাতির ময়নাতদন্তে যুক্ত কয়েকজন ভেটেরিনারি কর্মকর্তার দাবি, মৃত হাতির বড় একটি অংশের শরীরে আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
তাদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে গুলির বিষয়টি স্পষ্টভাবে সামনে এলেও সব ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে একইভাবে নথিভুক্ত হয় না।
ময়নাতদন্তে মিলছে গুলির আলামত
বন্যপ্রাণীর ময়নাতদন্তে যুক্ত সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের মতে, বহু হাতির শরীর থেকে ধাতব গুলি বা ছররা উদ্ধার করা হয়েছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী—
- মাথা,
- চোখের আশপাশ,
- ঘাড়,
- কাঁধ
এ ধরনের স্পর্শকাতর স্থানে গুলির আঘাত বেশি দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়ে থাকতে পারে।
হাতির করিডর দখলও বড় কারণ
সংরক্ষণবিদদের মতে, হাতি হত্যার পেছনে শুধু অস্ত্রের ব্যবহার নয়, বনাঞ্চলের ক্রমাগত সংকোচনও একটি বড় কারণ।
অনেক স্থানে—
- অবৈধ বসতি,
- কৃষিজমি,
- মাছের ঘের,
- বাগান,
- খামার
গড়ে ওঠায় হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ফলে হাতির পাল বাধ্য হয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে এবং সংঘাত বাড়ছে।
বন বিভাগের পর্যবেক্ষণ
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, হাতি সংরক্ষণে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন—
- হাতির করিডর পুনরুদ্ধার,
- বন দখলমুক্ত করা,
- নিয়মিত টহল বৃদ্ধি,
- অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার,
- স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি,
- বিকল্প ফসল সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করা।
তাদের মতে, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের বন্য হাতির সংখ্যা ইতোমধ্যেই আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক হাতির মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানি নয়; এটি পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্য বড় ক্ষতি।
তাদের মতে, হাতির চলাচলের করিডর সুরক্ষা, অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।