বরিশাল, ২৫ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): জেলায় ৩ দিনব্যাপী ‘প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ও শিশুর মনোসামাজিক সুরক্ষা’ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা, যত্ন, অধিকার, মানসিক সুস্থতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সেবার মানোন্নয়নকে সামনে রেখে আয়োজিত এই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় শিশু সুরক্ষার বহুমাত্রিক দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বরিশাল, ২৫ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): জেলায় ৩ দিনব্যাপী ‘প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ও শিশুর মনোসামাজিক সুরক্ষা’ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা, যত্ন, অধিকার, মানসিক সুস্থতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সেবার মানোন্নয়নকে সামনে রেখে আয়োজিত এই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় শিশু সুরক্ষার বহুমাত্রিক দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন বরিশাল আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। তিন দিনের এ কর্মসূচিতে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার সকাল ৯টায় আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তিন দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে শিশু সুরক্ষাকে কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে নয়, বরং একটি গভীর মানবিক ও সামাজিক অঙ্গীকার হিসেবে দেখার আহ্বান জানানো হয়।
শিশু সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব
বর্তমান সময়ে শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে রয়েছে অথবা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠছে, তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশের প্রয়োজন আরও বেশি।
প্রশিক্ষণ কর্মশালায় শিশুদের নিরাপত্তা, যত্ন, সুরক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর ও মানসম্মত করার ওপর আলোকপাত করেন প্রধান অতিথি বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ।
তিনি বলেন, জন্ম, ধর্ম, বর্ণ কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। পৃথিবীর সব মানুষ সমান মানবিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার রাখে। মানুষে মানুষে যে পার্থক্য ও বিভাজন বিদ্যমান, তার অধিকাংশই সমাজ ও মানুষের তৈরি।
তাই প্রত্যেকের উচিত মানুষকে প্রথমে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করা।
বিভাগীয় কমিশনারের বক্তব্যে মানবিক মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক দর্শনের যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ একটি শিশুর পরিচয়, পারিবারিক অবস্থা বা সামাজিক অবস্থান তার অধিকার ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্যের কারণ হতে পারে না।
মনোসামাজিক সুরক্ষা কেন গুরুত্বপূর্ণ
শিশুর সুরক্ষা বলতে শুধু শারীরিক নিরাপত্তাকে বোঝায় না। একটি শিশুর মানসিক, আবেগীয় ও সামাজিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুরা যদি অবহেলা, ভয়, বৈষম্য, নির্যাতন কিংবা দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে ওঠে, তাহলে তার প্রভাব তাদের আচরণ, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ বিকাশে পড়তে পারে। অনেক সময় এসব সমস্যার বহিঃপ্রকাশ সরাসরি দেখা যায় না। শিশুর আচরণগত পরিবর্তন, একাকিত্ব, অতিরিক্ত নীরবতা কিংবা অস্বাভাবিক ভীতিও গভীর মানসিক চাপের ইঙ্গিত হতে পারে।
এ কারণে শিশুদের সঙ্গে কাজ করা কর্মকর্তা ও কর্মীদের মনোসামাজিক সুরক্ষা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান থাকা জরুরি।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শিশুদের প্রতি আরও দায়িত্বশীল ও মানবিক আচরণ, তাদের অধিকার রক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে অনুষ্ঠানে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নিরাপদ পরিবেশ তৈরির আহ্বান
প্রধান অতিথি প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে বলেন, প্রতিটি শিশু যেন নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে, সে লক্ষ্যে সবাইকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।
একটি শিশুর জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান তখনই প্রকৃত অর্থে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে, যখন সেখানে শুধু খাবার, পোশাক ও বাসস্থানের ব্যবস্থা থাকে না, বরং শিশুর কথা শোনা হয়, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং তার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা হয়।
শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠানকে একটি আস্থার জায়গা হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীল তত্ত্বাবধান, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, সহানুভূতিশীল আচরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা।
একজন প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা হয়তো একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিকে অন্যদের তুলনায় দ্রুত শনাক্ত করতে পারবেন। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে একটি শিশুকে বড় ধরনের ক্ষতি থেকেও রক্ষা করা সম্ভব।
মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার
অনুষ্ঠানে মানবিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ।
তিনি বলেন, সমাজে বিভেদ নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গিই ধর্ম-বর্ণ ও সামাজিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি মানবিক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে এই মূল্যবোধের প্রয়োজন আরও গভীর। কারণ শৈশবের অভিজ্ঞতা একজন মানুষের মানসিক কাঠামো ও সামাজিক আচরণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
একটি শিশু যদি নিয়মিত সম্মান, নিরাপত্তা ও সহমর্মিতা পায়, তাহলে তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং ইতিবাচক সামাজিক আচরণ বিকশিত হওয়ার সুযোগ বাড়ে। বিপরীতে বৈষম্য ও অবহেলা তার মানসিক বিকাশে প্রতিকূল অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারে।
প্রশিক্ষণে ৩০ জন অংশগ্রহণ
প্রশিক্ষণ কর্মশালায় মোট ৩০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশগ্রহণ করেন। তিন দিনের কর্মসূচিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রশিক্ষণ ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
শিশুদের অধিকার, নিরাপত্তা, যত্ন, মানসিক সুস্থতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে প্রশিক্ষণার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রশিক্ষণের সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনজন শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণার্থীর মাঝে পুরস্কার প্রদান করা হয়। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও প্রশিক্ষণকালীন পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
এ ধরনের স্বীকৃতি প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরি করার পাশাপাশি পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে উৎসাহ জোগাতে পারে।
উপস্থিত ছিলেন সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তারা
আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ সাজ্জাদ পারভেজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক শাহ মো. রফিকুল ইসলাম, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক শাহজাদী আক্তার, হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যালয়ের সমাজসেবা কর্মকর্তা দিলরুবা রইচি, শহর সমাজসেবা কার্যালয়ের সমাজসেবা কর্মকর্তা শেখ জহির উদ্দিন আহম্মদ, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তা ইসমত আরা খানম এবং সরকারি শিশু পরিবার বালিকার উপ-তত্ত্বাবধায়ক ফারজানা রহমান।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের লেকচারার মোসা. সামসুন্নাহার।
এ সময় বিভিন্ন ক্যাটাগরির প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
শিশু সুরক্ষায় আরও কার্যকর উদ্যোগের প্রত্যাশা
বরিশাল অঞ্চলে আয়োজিত এই তিন দিনের প্রশিক্ষণ কর্মশালা শিশু সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সেই নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ জনবল, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা কাঠামো।
বিশেষ করে মনোসামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি এখন শিশু কল্যাণ ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ। শিশুর শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি তার আবেগ, আত্মমর্যাদা, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক স্থিতিস্থাপকতার বিষয়েও নজর দিতে হবে।
তিন দিনের এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মীদের মধ্যে সেই উপলব্ধি আরও সুসংহত হয়েছে বলে আশা করা যায়।
একটি শিশুর জন্য নিরাপদ প্রতিষ্ঠান মানে শুধু একটি ছাদ নয়। এটি এমন একটি পরিসর, যেখানে শিশু নিজেকে সম্মানিত, সুরক্ষিত এবং গ্রহণযোগ্য মনে করে। সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই শিশু সুরক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য।
২৫ আগস্ট, ২০২৬ অনুষ্ঠিত এই সমাপনী কর্মসূচির মাধ্যমে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাই সামনে এসেছে: শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকেও হতে হবে মানবিক, দায়িত্বশীল, জবাবদিহিমূলক এবং শিশুবান্ধব।