ব্রুনেইয়ের রাজপরিবারে বিরল এক সিদ্ধান্ত ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। ব্রুনেইয়ের সুলতান তাঁর এক পুত্রবধূর সব রাজকীয় উপাধি কেড়ে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁর আচরণ ‘অশোভন’। তবে ঠিক কী ধরনের আচরণের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
তথ্যসূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট
ব্রুনেইয়ের রাজপরিবারে বিরল এক সিদ্ধান্ত ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। ব্রুনেইয়ের সুলতান তাঁর এক পুত্রবধূর সব রাজকীয় উপাধি কেড়ে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁর আচরণ ‘অশোভন’। তবে ঠিক কী ধরনের আচরণের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
অবিলম্বে কার্যকর হলো রাজকীয় উপাধি বাতিল
চলতি মাসের শুরুতে ব্রুনেই দারুসসালামের গ্র্যান্ড চেম্বারলেইনের কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে এ খবর নিশ্চিত করে বলা হয়েছে, সুলতান হাসানাল বলকিয়াহর এক আদেশের পর তা ‘অবিলম্বে কার্যকর’ করা হয় এবং তাঁর পুত্রবধূর রাজকীয় উপাধিগুলো বাতিল করা হয়েছে। ৭ আগস্টের ঘোষণায় এই সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে আসে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সুলতান হাজি হাসানাল বলকিয়াহর প্রতি অসম্মান প্রদর্শন এবং রাজপরিবারের একজন সদস্যের স্ত্রী হিসেবে অনুপযুক্ত আচরণের কারণে পেঙ্গিরান রাবিয়াতুল আদাউইয়াহর উপাধি প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাঁর কর্মকাণ্ড রাজপরিবারের সুনামও ক্ষুণ্ন করেছে।’
রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম আরটিবি নিউজও জানিয়েছে, তাঁর কর্মকাণ্ডে সুলতানের প্রতি অসম্মান এবং রাজতন্ত্রের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। কিন্তু অভিযোগের প্রকৃতি সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
কে এই রাবিয়াতুল আদাউইয়াহ?
৩৩ বছর বয়সী পেঙ্গিরান রাবিয়াতুল আদাউইয়াহ ব্রুনেইয়ের প্রিন্স আবদুল মালিকের স্ত্রী। আবদুল মালিক সিংহাসনের উত্তরাধিকার ক্রমে চতুর্থ স্থানে রয়েছেন। তাঁদের বিয়ে হয় ২০১৫ সালে।
বিয়ের পর রাবিয়াতুল আদাউইয়াহ রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক মর্যাদা লাভ করেন এবং তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘ইয়াং আমাত মুলিয়া পেঙ্গিরান আনাক ইস্তেরি’ উপাধি। সাম্প্রতিক রাজকীয় আদেশে সেই উপাধিই প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ব্রুনেইয়ের রাজপরিবারে উপাধি শুধু আনুষ্ঠানিক সম্বোধন নয়। রাজকীয় পদমর্যাদা, পারিবারিক অবস্থান ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রোটোকলের ক্ষেত্রেও এসব উপাধির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ফলে উপাধি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি নিছক একটি নাম পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং এটি রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ মর্যাদায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন।
কী করেছিলেন তিনি?
এই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
তবে রাবিয়াতুল আদাউইয়াহ ঠিক কী করেছেন, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। গ্র্যান্ড চেম্বারলেইনের দপ্তরও তাঁর কথিত ‘অনুপযুক্ত আচরণ’-এর নির্দিষ্ট বিবরণ দেয়নি। ফলে প্রকাশ্য তথ্যের বাইরে কোনো অভিযোগ বা গুজবকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
এখন পর্যন্ত সরকারি বক্তব্যের ভিত্তি হলো তিনটি বিষয়: সুলতানের প্রতি অসম্মান, রাজপরিবারের সদস্যের স্ত্রী হিসেবে অনুপযুক্ত আচরণ এবং রাজপরিবারের সুনাম ক্ষুণ্ন করা।

বিবাহবিচ্ছেদের ঘোষণা নেই
এই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রাবিয়াতুল আদাউইয়াহ এখনো প্রিন্স আবদুল মালিকের স্ত্রী। তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এ কারণেই বর্তমান সিদ্ধান্তটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
এর আগে ব্রুনেইয়ের রাজপরিবারে উপাধি প্রত্যাহারের কিছু ঘটনা বিবাহবিচ্ছেদের পর ঘটেছিল। কিন্তু এবার স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় পুত্রবধূর রাজকীয় মর্যাদা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আগেও উপাধি প্রত্যাহার করেছিলেন সুলতান
পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি সুলতান হাসানাল বলকিয়াহর জন্য সম্পূর্ণ নজিরবিহীন পদক্ষেপ নয়। অতীতে তাঁর সাবেক স্ত্রীদের রাজকীয় উপাধি প্রত্যাহারের ঘটনাও ঘটেছে।
২০০৩ সালে বিবাহবিচ্ছেদের পর তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মারিয়াম আবদুল আজিজের রাজকীয় উপাধি প্রত্যাহার করা হয়। এরপর ২০১০ সালে তাঁর তৃতীয় স্ত্রী আজরিনাজ মাজহার হাকিমের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর তাঁর রাজকীয় মর্যাদাও প্রত্যাহার করা হয়।
তবে রাবিয়াতুল আদাউইয়াহর ঘটনা এসব ঘটনার তুলনায় আলাদা। কারণ এখানে এখন পর্যন্ত বিবাহবিচ্ছেদের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই।
রাজকীয় বিয়ে ও চার সন্তান
প্রিন্স আবদুল মালিক ২০১৫ সালে রাজধানী বন্দর সেরি বেগাওয়ানের রাজপ্রাসাদে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে রাবিয়াতুল আদাউইয়াহকে বিয়ে করেন। প্রায় ১০ দিন ধরে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা উদ্যাপন করা হয় এবং এতে বিপুলসংখ্যক অতিথি অংশ নেন।
এই দম্পতির চার সন্তান রয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রিন্সেস মুথিয়া, প্রিন্সেস ফাতিয়্যাহ, প্রিন্সেস খালিশাহ এবং প্রিন্সেস নাবিলাহ।
মায়ের রাজকীয় উপাধি প্রত্যাহার করা হলেও সন্তানদের রাজকীয় উপাধিতে কোনো প্রভাব পড়েনি বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান সিদ্ধান্তটি রাবিয়াতুল আদাউইয়াহর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ।
সুলতান হাসানাল বলকিয়াহ ও ব্রুনেইয়ের রাজতন্ত্র
৮০ বছর বয়সী সুলতান হাসানাল বলকিয়াহ ব্রুনেইয়ের রাজতন্ত্রের কেন্দ্রীয় শাসক। তিনি ১৯৬৭ সালে ব্রুনেইয়ের ২৯তম সুলতান হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ২০২৬ সালে তাঁর সিংহাসনের ৫৯ বছর পূর্ণ হয়েছে।
তাঁর শাসনকাল বিশ্বের দীর্ঘতম রাজকীয় শাসনগুলোর একটি। ব্রুনেই বোর্নিও দ্বীপের উত্তর উপকূলে অবস্থিত একটি ছোট ও তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্র, যার চারদিকে মালয়েশিয়ার ভূখণ্ড রয়েছে।
সুলতান দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকারব্যবস্থায়ও অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছেন। ব্রুনেইয়ের রাজপরিবার দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইস্তানা নুরুল ইমানের ঐশ্বর্য
সুলতান হাসানাল বলকিয়াহ ইস্তানা নুরুল ইমানে বসবাস করেন, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আবাসিক রাজপ্রাসাদ হিসেবে পরিচিত। প্রাসাদটিতে ১ হাজার ৭৮৮টি কক্ষ রয়েছে।
ব্রুনেইয়ের বিপুল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসসম্পদ দেশটির অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন ধরে সমৃদ্ধ করেছে। সুলতানের দীর্ঘ শাসনামলে দেশটি বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
রাজতন্ত্রের এই জাঁকজমকপূর্ণ পরিমণ্ডলের মধ্যেই পুত্রবধূর উপাধি প্রত্যাহারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
সামনে কী?
বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্তের পর রাবিয়াতুল আদাউইয়াহর পারিবারিক ও রাজকীয় অবস্থান কীভাবে পরিবর্তিত হবে। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সরকারি তথ্য থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তাঁর আনুষ্ঠানিক রাজকীয় উপাধি প্রত্যাহার করা হয়েছে, কিন্তু তাঁর স্বামী প্রিন্স আবদুল মালিকের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের কোনো ঘোষণা আসেনি এবং তাঁদের সন্তানদের রাজকীয় মর্যাদাও বহাল রয়েছে।
সুলতানের আদেশে রাজকীয় উপাধি হারানোর এই ঘটনা ব্রুনেইয়ের রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, রাজকীয় প্রোটোকল এবং সুলতানের কর্তৃত্বের বিষয়টিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। তবে অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ নিয়ে অনুমান করা থেকে বিরত থাকাই যুক্তিসঙ্গত।