হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস নতুন করে মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র সামনে এনেছে। নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় হিমবাহ ধসের পর আকস্মিক বন্যা ও কাদামাটির প্রবল স্রোতে বিস্তীর্ণ অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাবে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। একই এলাকায় তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যা: ৫৫৮ নিখোঁজ, উদ্ধারকাজে চীনা কর্মীরা
হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস নতুন করে মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র সামনে এনেছে। নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় হিমবাহ ধসের পর আকস্মিক বন্যা ও কাদামাটির প্রবল স্রোতে বিস্তীর্ণ অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাবে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। একই এলাকায় তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, নেপালের বিভিন্ন এলাকায় মৃতের সংখ্যা ১৬০ ছাড়িয়েছে এবং শত শত মানুষ এখনও নিখোঁজ। দুই দেশের সীমান্তবর্তী দুর্গম ভূপ্রকৃতি, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতু এবং প্রবল পানিপ্রবাহ উদ্ধার তৎপরতাকে কঠিন করে তুলেছে।
হিমবাহ ধস থেকে বিপর্যয়ের সূত্রপাত
প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আকস্মিক বন্যা হিসেবে দেখা হলেও পরবর্তী তথ্য ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে হিমবাহ ধসকে বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হিমালয়ের উচ্চভূমি থেকে বরফ, পাথর, মাটি ও পানি একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে এসে নদীর প্রবাহকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়।
নেপালের রসুয়া জেলা এবং চীনের তিব্বতের গিরং অঞ্চলে এর প্রভাব সবচেয়ে তীব্র হয়েছে। প্রবল স্রোত নদী উপত্যকার বসতি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নেপালে ত্রিশূলী নদীর পানি অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এটি ছিল এমন এক দুর্যোগ, যেখানে সতর্ক হওয়ার সময় প্রায় ছিল না। পাহাড়ি নদীর স্রোত যখন হঠাৎ কয়েকগুণ বেড়ে যায়, তখন মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়ে।
তিব্বতে ৫৫৮ নিখোঁজ
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং অঞ্চলে ভূমিধসের ঘটনায় ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। একই ঘটনায় দুজন স্থানীয় বাসিন্দাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে।
সংখ্যাটি আগের হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি। উদ্ধার তৎপরতা বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকাও পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে কর্তৃপক্ষ নিয়মিত নতুন তথ্য যাচাই করছে।
এই অঞ্চলে বহু বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী যাতায়াত করছিলেন। কৈলাস-মানসসরোবরমুখী যাত্রীদের একটি অংশও বিপর্যয়ের সময় ওই বিস্তৃত অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উদ্ধারকাজে চীনা কর্মী ও বিশেষায়িত দল
দুর্যোগের পর তিব্বতের স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে। চীনা কর্তৃপক্ষ এক হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মীকে কাজে নিয়োজিত করেছে। তাঁদের সঙ্গে প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর, ড্রোন ও নৌযানও ব্যবহার করা হচ্ছে।
চীনের অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী, সামরিক সদস্য এবং প্রকৌশল দলও উদ্ধার অভিযানে যুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১,৫০০-এর বেশি কর্মীকে মোতায়েন করা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
তবে উদ্ধারকাজের পথ মোটেই মসৃণ নয়। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি এখনও রয়েছে। উপরদিকে একটি বাধাপ্রাপ্ত জলাধার বা barrier lake তৈরি হওয়ায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ফলে উদ্ধারকারীদের একদিকে নিখোঁজদের খুঁজতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
নেপালেও ভয়াবহ পরিস্থিতি
সীমান্তের দক্ষিণ দিকে নেপালের পরিস্থিতিও অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। রসুয়া জেলার পাশাপাশি নুওয়াকোট ও ধাদিংসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি ও কাদার স্রোত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাবে ১৬৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৮২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক রয়েছেন।
নেপালের সেনাবাহিনী ও পুলিশ উদ্ধারকাজে ব্যাপকভাবে অংশ নিচ্ছে। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অঞ্চলে জরুরি সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতুর কারণে স্থলপথে অনেক এলাকায় পৌঁছানো এখনও কঠিন।
বিদেশি নাগরিকদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ
এই দুর্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীর নিখোঁজ হওয়া। নেপালের নিখোঁজ তালিকায় ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আরও কয়েকটি দেশের নাগরিক রয়েছেন।
তিব্বতের গিরং অঞ্চলেও ২৬০ বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ থাকার তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক পর্যটন ও তীর্থযাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নিখোঁজদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি বড় দায়িত্ব হয়ে উঠেছে।
যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় উদ্ধার অভিযানের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো দ্রুত যোগাযোগ। কিন্তু এই ঘটনায় সেই ব্যবস্থাই বিভিন্ন জায়গায় ভেঙে পড়েছে।
বন্যার স্রোতে সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপরও প্রভাব পড়েছে। ফলে প্রত্যন্ত এলাকায় আটকে থাকা মানুষদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
ড্রোন, হেলিকপ্টার, নৌযান এবং অনুসন্ধানী কুকুর ব্যবহার করে তাই বিকল্প পদ্ধতিতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। উদ্ধারকাজে প্রযুক্তির এই বহুমাত্রিক ব্যবহার দুর্গম হিমালয় অঞ্চলে জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতার নতুন মাত্রা তৈরি করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্ন
এই বিপর্যয় কেবল একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং চরম আবহাওয়ার প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে আসছেন।
উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের বরফ ও হিমবাহের স্থিতিশীলতা পরিবর্তিত হতে পারে। এতে হঠাৎ বরফধস, ভূমিধস কিংবা আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয়ের খাড়া ভূপ্রকৃতি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল জলবায়ু এই ধরনের দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে নির্দিষ্ট এই ঘটনার প্রতিটি কারণ ও ট্রিগার নিয়ে তদন্ত এখনও চলমান। তাই জলবায়ু পরিবর্তনকে বৃহত্তর ঝুঁকির প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা উচিত, একমাত্র কারণ হিসেবে নয়।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জীবিতদের দ্রুত খুঁজে বের করা এবং নিখোঁজদের সন্ধান করা। সময় যত গড়াবে, দুর্গম ভূখণ্ড ও আবহাওয়ার প্রতিকূলতা ততই উদ্ধার অভিযানকে জটিল করতে পারে।
একই সঙ্গে নতুন বন্যা বা ভূমিধসের ঝুঁকি মোকাবিলাও জরুরি। বিশেষ করে তিব্বতের গিরং অঞ্চলে তৈরি হওয়া বাধাপ্রাপ্ত জলাধার পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী এই বিপর্যয় দেখিয়ে দিয়েছে, হিমালয়ের সৌন্দর্যের আড়ালে বসবাসকারী ও যাতায়াতকারী মানুষ কতটা ভঙ্গুর প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে রয়েছেন। পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কতা, আন্তঃসীমান্ত তথ্য বিনিময় এবং দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা এখন আর বিলাসিতা নয়।
এটি সময়ের দাবি।