ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেশটির ওপর কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারবে না। বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান নিজের অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার বিভিন্ন পথ তৈরি করেছে।
নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় কোনো ফল হবে না: ইরান
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেশটির ওপর কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারবে না। বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান নিজের অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার বিভিন্ন পথ তৈরি করেছে।
তেহরানের এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক আবারও তীব্র উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পরমাণু কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ভূমিকা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে।
ইরানের দৃষ্টিতে, নিষেধাজ্ঞা এখন আর নতুন কোনো কৌশল নয়। বরং এটি এমন একটি চাপ প্রয়োগের পদ্ধতি, যার সঙ্গে দেশটি বহু বছর ধরে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
নিষেধাজ্ঞাকে রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখছে তেহরান
ইরানের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা তাদের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবে না। তেহরানের যুক্তি, অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের চেষ্টা বাস্তবসম্মত নয়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময়ে বলেছে, ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা মূলত রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার। তেহরান মনে করে, আলোচনার পথ খোলা থাকলেও তা হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে।
এই অবস্থানের পেছনে একটি দীর্ঘ কূটনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। ২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্বের ছয় শক্তির মধ্যে পরমাণু চুক্তি বা JCPOA স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির অধীনে ইরান তার পারমাণবিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে সম্মত হয়েছিল এবং এর বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত কিছু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ তৈরি হয়।
কিন্তু ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয় এবং ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে। এরপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস আরও গভীর হয়।
অর্থনীতিতে চাপ, কিন্তু পুরোপুরি থামেনি বাণিজ্য
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ইরানের অর্থনীতিতে অবশ্যই পড়েছে। তেল রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা, ব্যাংকিং লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশটি বিভিন্ন বাধার মুখোমুখি হয়েছে।
তবে ইরান দাবি করে, নিষেধাজ্ঞা তার অর্থনীতিকে পুরোপুরি অচল করতে পারেনি।
দেশটি চীনসহ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়িয়েছে। পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প লেনদেন পদ্ধতি ব্যবহার এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে তেহরান নিষেধাজ্ঞার অভিঘাত সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এই প্রক্রিয়াকে অনেক বিশ্লেষক একটি ধরনের অর্থনৈতিক অভিযোজন হিসেবে দেখেন। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা যত কঠোর হয়েছে, ইরানও তত বেশি বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা, বাণিজ্যপথ ও অংশীদার খুঁজেছে।
তেল বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব
ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশটির তেল শিল্প। ইরান বিশ্বের অন্যতম বড় তেল ও গ্যাসসম্পদসমৃদ্ধ দেশ। ফলে দেশটির তেল উৎপাদন বা রপ্তানিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে যেকোনো উত্তেজনা বিশ্ববাজারে উদ্বেগ বাড়ায়। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি বাণিজ্য এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়।
ফলে ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা শুধু তেহরান ও ওয়াশিংটনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়। এর প্রতিক্রিয়া তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে।
বাজারের প্রতিক্রিয়া অনেক সময় রাজনৈতিক ঘোষণার চেয়েও দ্রুত হয়। নিষেধাজ্ঞার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় জ্বালানি সম্পদের দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ
ইরানের অর্থনৈতিক কৌশলে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে আছে। চীন ইরানের অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বহু বছর ধরে সম্প্রসারিত হয়েছে।
এই সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় তেহরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছে।
ইরানের জন্য বিষয়টি শুধু তেল বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অবকাঠামো, পরিবহন, শিল্প এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যেও চীনের সঙ্গে সহযোগিতা তেহরানের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় প্রশ্ন হলো, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই কি ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব?
বাস্তবে উত্তরটি সহজ নয়।
নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সাধারণত একটি রাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করার জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নির্ভর করে একাধিক বিষয়ের ওপর।
প্রথমত, নিষেধাজ্ঞা কতটা বিস্তৃত। দ্বিতীয়ত, বিকল্প বাণিজ্যিক অংশীদার পাওয়া যাচ্ছে কি না। তৃতীয়ত, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কতটা রয়েছে। চতুর্থত, যে রাষ্ট্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তার অর্থনৈতিক সহনশীলতা কতটা।
ইরানের ক্ষেত্রে এসব উপাদানই জটিল।
দেশটির অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে অভিযোজিত হয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও এশীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক তেহরানকে কিছু বিকল্প দিয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ অকার্যকর। অর্থনৈতিক চাপ ইরানের প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, মুদ্রার স্থিতিশীলতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারে।
অতএব, তেহরানের বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রকাশ হলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা আরও জটিল।
পরমাণু ইস্যুই বড় কেন্দ্র
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ওয়াশিংটন ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তেহরান অবশ্য দাবি করে, তার পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
এই পারস্পরিক সন্দেহই কূটনৈতিক অচলাবস্থাকে দীর্ঘায়িত করেছে।
পরমাণু ইস্যুতে কোনো সমঝোতা হলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পথ তৈরি হতে পারে। আবার আলোচনা ভেঙে গেলে নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ আরোপের সম্ভাবনাও বাড়ে।
তাই নতুন নিষেধাজ্ঞাকে বিচ্ছিন্ন কোনো অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এটি বৃহত্তর কূটনৈতিক দর-কষাকষির অংশ।
আঞ্চলিক রাজনীতিতেও প্রতিক্রিয়া
ইরান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী রাষ্ট্র। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইরানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে মতবিরোধ রয়েছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞা সেই ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও তীব্র করতে পারে।
একদিকে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে চায়। অন্যদিকে তেহরান দেখাতে চায় যে বাইরের চাপ তার কৌশলগত অবস্থান বদলাতে পারবে না।
এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশকে আরও অনিশ্চিত করতে পারে।
সামনে কী হতে পারে
নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর ইরান যে বলছে এতে কোনো ফল হবে না, তা মূলত তেহরানের রাজনৈতিক বার্তা। কিন্তু বাস্তবে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নির্ভর করবে এর পরিধি, প্রয়োগের কঠোরতা এবং অন্যান্য দেশ কীভাবে তা মেনে চলে তার ওপর।
বিশ্ববাজারও নজর রাখবে ইরানের তেল রপ্তানির দিকে। সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তেলের দাম বাড়তে পারে। আর জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব পরিবহন থেকে শুরু করে খাদ্য ও শিল্প উৎপাদন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে কি না, তা নয়। বরং বড় প্রশ্ন হলো, এই অর্থনৈতিক চাপ কি ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনবে, নাকি দুই পক্ষের মধ্যে বিভাজন আরও গভীর করবে?
তেহরান আপাতত দৃঢ়। ওয়াশিংটনও চাপ কমানোর কোনো সহজ সংকেত দিচ্ছে না।
এই টানাপোড়েনের পরবর্তী অধ্যায় তাই কূটনীতি, জ্বালানি বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।