যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় ‘উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতি’, ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে নতুন রূপরেখা
সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রথম দফার উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ‘উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতির’ মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার ও পাকিস্তান। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সোমবার ভোরে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে কাতার ও পাকিস্তান জানায়, উভয় পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি রূপরেখায় সম্মত হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে কারিগরি ও কূটনৈতিক পর্যায়ে ধারাবাহিক আলোচনা চলবে এবং বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয়ে সমাধানের পথ খোঁজা হবে।
কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে?
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (Memorandum of Understanding) স্বাক্ষরিত হয়। ওই সমঝোতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে একমত হয়।
চলমান আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল।
মধ্যস্থতাকারীদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থা গঠন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সমুদ্রপথে ভুল বোঝাবুঝি, দুর্ঘটনা বা সামরিক উত্তেজনা এড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
লেবানন সংকটেও সমাধানের চেষ্টা
আলোচনায় লেবাননের চলমান সংঘাত বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং লেবাননের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে একটি ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’ বা সংঘাত নিরসন সেল গঠনের বিষয়ে সম্মতি হয়েছে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দক্ষিণ লেবাননে চলমান সামরিক সংঘর্ষ কমিয়ে আনা এবং যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা জোরদার করা হবে। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় সহযোগিতা করবে বলেও জানানো হয়েছে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ আব্বাস আরাঘচি আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, প্রথম দফার বৈঠকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও সময় ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন হবে।
ট্রাম্পের সতর্কবার্তা
আলোচনা শুরু হওয়ার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানকে সতর্ক করে বলেন, লেবাননে তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
এর জবাবে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, হুমকি দিয়ে ইরানকে প্রভাবিত করা সম্ভব নয়। তিনি দাবি করেন, অতীতের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে চাপ সৃষ্টি করে তেহরানের অবস্থান পরিবর্তন করানো যায় না।
মাঠের পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক
কূটনৈতিক অগ্রগতির খবর এলেও দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি শান্ত নয়। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ এবং বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ বহু মানুষ নিহত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন একটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়। তবে উভয় পক্ষই এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি।
পারমাণবিক কর্মসূচি বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। যদিও ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
চূড়ান্ত চুক্তির পথে অগ্রসর হতে হলে এই ইস্যুতে উভয় পক্ষকে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে হবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সামনে কী?
মধ্যস্থতাকারীদের আশা, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং পারমাণবিক কর্মসূচিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি সম্ভব হবে।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কয়েক দশকের অবিশ্বাস ও সংঘাতের ইতিহাস বিবেচনায় চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে না। তবুও সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এই প্রথম দফার আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।